অসহায় এই বৃদ্ধা মায়ের করুণ আকুতিতে জাগ্রত হোক ঘুমিয়ে পড়া অগনিত সন্তানদের বিবেক
  • picture

ঠাকুরগাঁও হরিপুর উপজেলার ডাঙ্গীপাড়া এলাকার নির্যাতিতা সেই আলোচিত বৃদ্ধা ‘মা’ ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। চোখের আঘাতের ক্ষত অনেকাংশে পূরণ হতে শুরু করেছে। প্রসঙ্গ, ছেলের বউয়ের কাছে ভাত চেয়েছিলেন শতবর্ষী বৃদ্ধা মা তসলিমা। একথা ছেলে দবির উদ্দীন জানতে পেরে লাঠি দিয়ে মাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেন। লাঠির আঘাতে তসলিমার বাঁ চোখের পাশ থেতলে যায় । পরে এই ঘটনা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যপক আলোচনা ও প্রতিবাদের পর ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল ওই বৃদ্ধা মাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। এরপর ঐ বৃদ্ধা মাকে নির্যাতনের অভিযোগে ছেলেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে চিকিতসাধীন ঐ বৃদ্ধা মায়ের সাথে থাকা ছোট মেয়ে শরিফা জানান, দু’দিন ধরে বড় ভাইকে (বৃদ্ধার ছেলে) দেখার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছে মা। কিছু খেতেও চাই না। অস্থির করে তুলেছে শুধু ছেলেকে দেখার জন্য বাড়িতে যেতে চাচ্ছে।

নিজ সন্তানের হাতে নির্যাতনের পরেও একবার ছেলের মুখটা দেখার জন্য বৃদ্ধা মায়ের এমন আকুতি “মায়ের প্রতি শ্রদ্ধাটা বাড়িয়ে দিয়েছে আরও প্রবল আকারেই ”।

আঘাত দেয়া সেই সন্তান’কেই দেখার আর্তনাদ বৃদ্ধা মায়ের !

” সাংবাদিকলার তানেই মোর ছুয়াডাক পুলিশ ধরিয়েছে! ” [ভিডিওতে কথোপকথন ঠাকুরগাওয়ের আঞ্চলিক ভাষায় ]

বৃহস্পতিবার রাতে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালের দু’তলায় ৩নং কেবিনে নির্যাতিতা বৃদ্ধা মা’কে দেখতে গেলে ছেলেকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে উঠেন। বৃদ্ধা মা কেমন আছেন জানতে চাইলে বলেন, প্রতিদিন কত জনই মোক (আমাকে) দেখিবা (দেখতে) আসেছে (আসতেছে), কিন্তু মোর (আমার) ছুয়াডা (ছেলেটা) একবারও দেখিবা (দেখতে) আসেনি। মোর (আমার) ছুয়াডা (ছেলেটা) মনে হয় বিপদদত (বিপদে) পড়িছে (পড়েছে)। সে তানে (সেজন্যই) মোক (আমাকে) দেখিবা(দেখতে) আসে না। মোর (আমাকে) ছুয়াডার (ছেলেটার) কাছত (কাছে) নিয়া(নিয়ে) যাও, খুব দেখিবা (দেখতে) মনাইছে (ইচ্ছে করছে)। মুই( আমি) বাড়িত (বাড়িতে) যাম (যাব)। একটু (একবার) ছুয়াডার (ছেলেটার) মুখ খান দেখে আসিবা দো মোক (দেখে) আছি। সাংবাদিকলার তানে নাকি মোর ছুয়াডাক পুলিশ ধরিয়েছে (সাংবাদিকদের জন্য আমার ছেলেকে পুলিশ ধরেছে)। না হলে ঠিকই দেখিবিা আসিহিলে (না হলে অবশ্যই আমাকে দেখতে আসতো। এভাবেই কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেকে দেখার আকুতি জানিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন বৃদ্ধা মা।

একজন সংবাদ কর্মী হিসেবে সেই মায়ের আকুতিটা…..সাংবাদিকলার তানে নাকি মোর ছুয়াডাক পুলিশ ধরিয়েছে (সাংবাদিকদের জন্য আমার ছেলেকে পুলিশ ধরেছে)। না হলে ঠিকই দেখিবিা আসিহিলে (না হলে অবশ্যই আমাকে দেখতে আসতো। বৃদ্ধার মায়ের সেই আকুতি গুলো শুনে কেন জানি নিজের মধ্যে একধরনে সুপ্ত ‘অপরাধবোধেও’ ভুগেছি। বার বার নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করছি, আসলেই আমি কি দোষ করে ফেলেছি কোন ? আমিও কখনো চাই না “মাকে” কোন সন্তানের হাতে নির্যাতনের যেন না শিকার হতে হয়। আর সেই অপরাধে কোন সন্তানকে শাস্তি ভোগ করতে হোক।

সংবাদকর্মী হিসেবে অন্য সন্তানদের সচেতন করার জন্যই গণমাধ্যমে আমরা সংবাদকর্মীরা “বৃদ্ধা মায়ের নির্যাতনের” খবরটি প্রকাশ করেছি। কারণ সমাজে অনেক বৃদ্ধা মা পরিবারের বর্তমানে বোঝা হয়ে দাড়িয়েছেন, সেই সব খবর তুলে আনা সংবাদকর্মীর পক্ষেও তুলে আনা সম্ভব হয়ে উঠে না ।

সংবাদকর্মীরাও তো কোন মায়ের সন্তান। মানুষ ভালবাসা এবং ঘৃণাকে বোধ করি একই সাথে বুকে ধারণ করে থাকে। ‘মা’ কে ভালবাসি এমন কথা বলতে সবাই পছন্দ করে। মার জন্য কত টান তা আমরা নানা ভাবে প্রকাশ করে থাকি। মার জন্য ঘৃণা কতখানি তা প্রকাশে আমাদের সঙ্কোচ রয়েছে। আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ এতোখানি শক্ত যে, প্রকাশ্যে মাকে ঘৃণার কথা বলা যায় না। কম-বেশি সবাই মাকে ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় অবহেলা করে থাকে। সেই অবহেলা নানান রকমের হয়। একটু খেয়াল করলে দেখবেন সন্তান যতক্ষণ পর্যন্ত মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকে ততক্ষণ মায়ের জন্য অস্থির হয়ে উঠে। মায়ের স্নেহ-মমতা-ভালবাসা-আদর-সোহাগ পেতে সন্তানের আকুতি দেখার মতো।

সন্তান সারাক্ষণই মাকে কাছে পেতে চায়। মায়ের সেবা পেতে চায়। সন্তান যতো বড় হতে থাকে ততই মায়ের উপর নির্ভরতা কমে যায়। সন্তান এক সময় স্বনির্ভর হয়ে যায়। মা তখন সন্তান নির্ভর হতে তাকে। একটা সময় এসে পুরোপুরি সন্তান নির্ভর হয়ে যায়। আমাদের দেশে নারীর গড় আয়ু পুরুষের তুলনায় বেশি। আমাদের সমাজের প্রথা অনুযায়ী বিয়ের সময় নারীর বয়স পুরুষের চাইতে কম থাকে। বার্ধক্যে এসে নারীর আগে পুরুষ মৃত্যুবরণ করে। বৃদ্ধ নারী শেষ পর্যন্ত সন্তানের মাথায় বোঝা হিসেবে হাজির হয়। শুরু হয় ‘মা’-এর অপমান-লাঞ্ছনা-অবহেলা। মা যদি শক্তি-সামর্থ্যবান হন, পরিবারে সেবা-সাহায্য করার ক্ষমতা রাখেন তবে কিছুটা গুরুত্ব মাঝে মধ্যে পেয়ে থাকেন। নাতি-নাতনির যত্ন এবং দেখাশোনার ক্ষমতা থাকলে ‘মা’ কিছুটা গুরুত্ব পান। সেবা দেবার ক্ষমতা যতো কমতে থাকে মা ততই গুরুত্বহীন হতে থাকে। আমাদের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে মা নিরপেক্ষ থাকেন না। কোন না কোন সন্তানের প্রতি কিছুটা বেশি দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। সন্তানরা জানেন মা কাকে বেশি পছন্দ করে। মা সবসময়ই শক্তিমান সন্তানকে গোপনে সমর্থন করেন। কারণ মা বুঝতে পারেন তার কোন্ সন্তানটি বেশি উজ্জ্বল এবং সম্ভাবনাময়।

আসুন আমরা বৃদ্ধ বয়সে মা’কে যেন অবহেলা চোখে না দেখি । এটাই প্রত্যাশা সকল সন্তানের কাছে।

তানভীর হাসান তানু সংবাদকর্মী,ঠাকুরগাঁও

ফিরে দেখা এই সংবাদের ঘটনাক্রম

১৫ আগস্ট মঙ্গলবার সকালে নির্মম ঘটনাটি ঘটে ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার ৪নং ডাঙ্গীপাড়া ইউনিয়নের ডাঙ্গীপাড়া গ্রামে। পাষন্ড ছেলের নির্যাতনের শিকার বৃদ্ধা ‘মা’ ঐ গ্রামের মৃত সফিরউদ্দীনের স্ত্রী তাসলেমা খাতুন (৯৮)। এমন অমানবিক ঘটনার পর প্রতিবাদের ঝড় উঠে , এগিয়ে আসে ঠাকুরগাওয়ের বেশ কজন সাংবাদিক সহ নানা শ্রেনী-পেশার মানুষ। অবশেষে আজ বুধবার হরিপুরে ঐ বৃদ্ধা মাকে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে উন্নত চিকিতসার জন্য নিয়ে এসেছেন তারা।

গনমাধ্যমে অসহায় ঐ বৃদ্ধা মায়ের ছবি প্রকাশিত হলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ব্যপক আলোচিত হবার পর জেলা সদর থেকে বৃদ্ধার বাড়ি হরিপুরে ছুটে যান ঠাকুরগাওয়ের জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল সহ একদল সংবাদকর্মী। এরপর সদরে এনে ভর্তি করান হাসপাতালে ।

এর আগে গ্রামবাসী জানায়, বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুনের স্বামী মারা যাওয়ার ৩০ বছর হয়। মারা যাওয়ার সময় তার স্বামী দুই ছেলে দুই মেয়ে রেখে যায়, এবং দুই ছেলের নামে ৩ একর ৩০ শতাংশ জমি দলিল দেয়। এবং বসতভিটা বড় ছেলের ছেলে (নাতি) চালাকি করে বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুনের কাছ থেকে দলিল করে নেয়। সেই বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুন চোখে ঠিক মতো দেখা না, কানে তেমন শোনে না, মুখে কথা বলতে পারে না।

সরেজমিনে জানা যায়, মঙ্গলবার (১৫ই আগষ্ট) সকালে বৃদ্ধা তাসলেমা খাতুন ক্ষুধার্ত ছিলেন, তখন তিনি বড় বৌমার কাছে ভাত চাইতে গেলে এ ঘটনা ঘটে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গ্রামবাসী জানায়, খাবার কে কেন্দ্র করে বউয়ের কথায় ছেলে বদিরউদ্দীন বৃদ্ধা মায়ের মুখ বরাবর আঘাত করে। ঘটনাস্থলে বৃদ্ধা মায়ের বাম চোখের নিচ অংশ ক্ষত হয়ে রক্ত পাত হয়। নির্যাতন শেষে বাড়ির বাহিরে ফেলে রেখে যায়। তখনি গ্রামবাসীরা বৃদ্ধা মাকে মুমূর্ষু অবস্থা দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে ভর্তি করে।

কর্মরত চিকিৎসক জানায়, রোগীর অবস্থা খুব খারাপ তাকে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠাতে হবে। অসহায় বৃদ্ধা মা’কে বাড়ি থেকে আনতে ছুটে যান ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক আব্দুল আউয়াল। ছবিতে সাদা শার্ট পরিহিত জেলা প্রশাসক

এই বিষয়ে ছোট ছেলে হরিপুর উপজেলা শাখার বিআরডিবির কর্মচারী মোসলেমউদ্দীন (সুধু) মুঠোফোনে বলেন, ঘটনার সময় আমি ছিলাম না। এভাবে বৃদ্ধা মাকে মারধর করা ঠিক হয়নি।

পুলিশ জানায়, উপজেলার ওই গ্রামের তসলিমা খাতুনকে (৯৫) তার বড় ছেলে দবির উদ্দীন নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে জখম করেছে। মা তসলিমা ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ বিষয়ে হরিপুর থানার ওসি রুহুল কুদ্দুস জানান, ঘটনার পরদিন বুধবার রাতে পুলিশ দবির উদ্দীনকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করেছে।

জানা গেছে, তসলিমার স্বামী সফির উদ্দীন ৩০ বছর আগে মারা যান। তিনি ছেলেদের জায়গা জমি দিয়ে গেছেন। কিন্তু তারা তাদের মাকে দেখভাল করতে অনীহা প্রকাশ করে আসছিল।